বিশ্বজুড়ে ধনী-গরিবের বৈষম্য ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। এ বৈষম্য আরো সম্প্রসারণ ঘটাতে পারে আগামী এক দশকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরিত হতে যাওয়া উত্তরাধিকার সম্পদ। এ ধরনের সম্পদের আকার হতে পারে ৭০ ট্রিলিয়ন বা ৭০ লাখ কোটি ডলার। অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের একটি কমিটি সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছে, বিপুল পরিমাণের সম্পদ হস্তান্তর সামাজিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক সমতার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। উচ্চ বৈষম্যের দেশগুলোয় গণতন্ত্রের অবনতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি বলেও মন্তব্য করেছেন তারা। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
প্রতিবেদন তৈরিতে ইতালির অর্থনীতিবিদ সালভাতোরে মোরেল্লির এক গবেষণার বরাত দেয় কমিটি। যেখানে দেখা যাচ্ছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৭০ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ উত্তরাধিকারসূত্রে প্রজন্মান্তরে স্থানান্তর হবে।
এ বিষয়ে বলা হয়েছে, সম্পদ বন্টনে বৈষম্যের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গতি রয়েছে। কারণ চক্রবৃদ্ধি সুদের প্রভাবে দিনে দিনে ক্রমবর্ধমান হারে সম্পদের আকার বাড়ে। কার্যকর উত্তরাধিকার করের অভাবে এসব সম্পদ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। এতে সামাজিক গতিশীলতা ও অর্থনৈতিক দক্ষতা ক্রমে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে চলতি মাসের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জি২০ বৈঠক। সে আয়োজনকে সামনে রেখে প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, উত্তরাধিকার সম্পদ হস্তান্তরে সৃষ্ট বৈষম্য মোকাবেলায় প্রভাবশালী এ জোটভুক্ত দেশগুলোর উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তঃসরকার প্যানেল আইপিসিসিকে উদাহরণ হিসেবে সামনে এনেছেন অর্থনীতিবিদ ও অ্যাক্টিভিস্টরা। তাদের মতে, এ ধরনের স্থায়ী পর্যবেক্ষণ সংস্থা গঠন না হলে আগামী দশকে বিশ্বজুড়ে ধনী-গরিবের সম্পদ বৈষম্য আরো গভীর হবে।
প্রতিবেদনটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ। তিনি জানান, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসারের অনুরোধে বিশেষজ্ঞ দল প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে।
সেখানে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রতি ১০টির মধ্যে আটেরও বেশি দেশে সম্পদ বৈষম্য বাড়ছে। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুসরণ করলে বলতে হবে, বিশ্বের ৮৩ শতাংশ দেশই ‘উচ্চ বৈষম্যপূর্ণ’। এসব দেশে বৈশ্বিক জনসংখ্যার ৯০ শতাংশেরও বেশি বসবাস করে।
আরো বলা হয়েছে, সম্পদ বন্টনে বৈষম্যের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র। গবেষণায় দেখা যায়, উচ্চ বৈষম্যের দেশগুলোয় গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশঙ্কা সম্পদ বণ্টনে কম বৈষম্য রয়েছে এমন দেশগুলোর তুলনায় সাত গুণ বেশি।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার মতে, স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত ‘একটি অসাধারণ কমিটি’ এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে ধনী-গরিবের মাঝে সম্পদগত বৈষম্য কমিয়ে আনতে বিষদ রূপরেখা দেখা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী বেড়ে চলা ধনী-গরিব বৈষম্যের বিষয়টি আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনার পরিকল্পনা রয়েছে জি২০-এর। সে উদ্যোগকে সমর্থন করছে নতুন এ প্রতিবেদন।’
তবে বিশ্লেষকদের মতো করে ধনী-গরিবের ফারাক পর্যবেক্ষণে সরাসরি উচ্চ পর্যায়ের প্যানেল গঠনের আহ্বান জানাননি সিরিল রামাফোসা। তিনি বলেন, ‘মানুষের মর্যাদার প্রতি একপ্রকার বিশ্বাসঘাতকতা হলো বৈষম্য। এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির অন্তরায় ও গণতন্ত্রের প্রতি এক ভয়াবহ হুমকি। বৈষম্য দূর করা আমাদের প্রজন্মের অনিবার্য দায়িত্ব। প্রতিবেদনটিতে বৈষম্য কমিয়ে আনতে বাস্তবসম্মত ও বিচক্ষণ পদক্ষেপের দিকনির্দেশ দিয়েছে।’
২০০৮ সালে বৈশ্বিক ব্যাংক খাতে সৃষ্ট সংকটের পর গঠিত হয় জি২০। এতে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর জোট জি৭-এর সদস্যরা ছাড়াও প্রতিনিধিত্বমূলক অন্যান্য দেশের অন্তর্ভুক্তি রয়েছে। যাদের মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা।
সামাজিক বা অর্থনৈতিক ন্যায় ও সমতার জন্য কাজ করেন এমন সংগঠকরা আশা করছেন, ২২ নভেম্বর জি২০-এর মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বৈষম্য পর্যবেক্ষণের জন্য একটি প্যানেল গঠনের প্রস্তাব উঠবে। এতে সমর্থন করবে জার্মানিসহ কয়েকটি দেশ।
কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান জোসেফ স্টিগলিৎজ বলেন, ‘কমিটির প্রধান সুপারিশ হলো, জি২০-এর একটি স্থায়ী প্যানেল গঠন করতে হবে। এটি ধনী-গরিবের বৈষম্যের প্রবণতা পর্যবেক্ষণ ও এর পরিণতি মূল্যায়ন করবে। বৈষম্য মোকাবেলায় সম্ভাব্য বিকল্প নীতিগুলোর কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে সরকার, নীতিনির্ধারক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবহিত করবে এ প্যানেল।’
তিনি আরো জানান, ধনী-গরিবের ব্যবধান যত বাড়ে ততই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়। একই সঙ্গে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির (পপুলিজম) প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়ে।
নতুন বিশ্লেষণের বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী ব্যক্তির দখলে রয়েছে ২০০০-২৪ সালের মধ্যে বিশ্বে সৃষ্ট সম্মিলিত নতুন সম্পদের ৪১ শতাংশ। এর বিপরীতে সম্পদ শ্রেণীর নিচের দিকে ৫০ শতাংশ মানুষের হাতে গেছে মাত্র ১ শতাংশ।
এদিকে উত্তরাধিকার সম্পদের করসংক্রান্ত আলাপ এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন ফোরামে আলোচনার অংশ হয়েছে। যুক্তরাজ্যসহ একাধিক দেশ এ বিষয়ে উদ্যোগ প্রস্তাব করেছে। এতে ওই সব দেশ থেকে ধনীদের অভিবাসনের প্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) এক প্রতিবেদন অনুসারে, সুসংহত উত্তরাধিকার করনীতি দেশগুলোয় রাজস্ব সংগ্রহ ও ধনী-গরিব বৈষম্য কমাতে সহায়ক হতে পারে।